বাংলাদেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো কৃষিখাত। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। ধান, গম, ভুট্টা, সবজি, ফলমূল, মাছ ও প্রাণিসম্পদ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে কৃষি বিশাল অবদান রেখে চলেছে। তবে আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি কৃষিখাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কৃষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত করতে কৃষি বিষয়ক কর্মশালা আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি বিষয়ক কর্মশালার মাধ্যমে কৃষকদের হাতে-কলমে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি শেখানো সম্ভব। উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার, মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা, সঠিক সার প্রয়োগ, সেচ ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিলে কৃষকরা অধিক ফলন উৎপাদনে সক্ষম হবেন। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে লাভজনক কৃষি ব্যবস্থাও গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেশের কৃষিখাতে ব্যাপকভাবে পড়ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, খরা, বন্যা ও নদীভাঙনের কারণে অনেক কৃষক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকদের আধুনিক ও টেকসই কৃষি পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি। কৃষি কর্মশালার মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীল ফসল, পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কৃষকদের বাস্তব ধারণা দেওয়া সম্ভব।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ সম্পর্কেও কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না। কর্মশালার মাধ্যমে কৃষকদের আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতি, অনলাইন বাজারব্যবস্থা এবং কৃষিভিত্তিক উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা গেলে কৃষিখাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে কৃষির প্রতি আগ্রহী করে তুলতে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি প্রশিক্ষণ অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। বর্তমানে স্মার্ট কৃষি, ড্রোন প্রযুক্তি, হাইড্রোপনিকস, ছাদ কৃষি এবং জৈব কৃষির মতো নতুন ধারণাগুলো জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। কৃষি বিষয়ক কর্মশালার মাধ্যমে এসব আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে তরুণদের জানানো গেলে শিক্ষিত যুবকদের কৃষিখাতে অংশগ্রহণ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
গ্রামীণ পর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন । ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত কৃষি কর্মশালা আয়োজন করা গেলে কৃষকরা সরাসরি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময় ও সমস্যা সমাধানের সুযোগ পাবেন। এতে কৃষি উৎপাদন আরও টেকসই ও কার্যকর হবে।
কৃষিখাতকে আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হলে প্রশিক্ষণ ও গবেষণার বিকল্প নেই। তাই সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কৃষি বিষয়ক কর্মশালার সংখ্যা বাড়ানো সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে দেশের কৃষকরা আধুনিক জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে উঠবেন এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।