বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার নিম্ন আয়ের কিছু গ্রাহকের জন্য সীমিত স্বস্তি নিয়ে এলেও সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে যাচ্ছেন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। নতুন দামে মাসিক বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় সংসারের ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর পল্লবীর বাসিন্দা তানিয়া বেগম দুই কক্ষের একটি ফ্ল্যাটে লাইট, ফ্যান ও ফ্রিজ ব্যবহার করেন। গত মাসে তার বিদ্যুৎ বিল এসেছে প্রায় আড়াই হাজার টাকা। নতুন মূল্যহার কার্যকর হলে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য তাকে অতিরিক্ত প্রায় ৫০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে।
এ বিষয়ে তানিয়া বেগম বলেন, বর্তমানে কাঁচাবাজার, মাছ, মাংসসহ প্রায় সব পণ্যের দামই বেড়েছে। গ্যাসের খরচও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের বিল আরও বাড়লে মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুতের ১৮ থেকে ২০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর। ব্যবহারভেদে তাদের মাসিক খরচ ১০০ টাকা থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। আয় না বাড়লেও হঠাৎ করে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবারগুলোকে নতুন আর্থিক চাপে পড়তে হবে।
শুধু আবাসিক গ্রাহকরাই নন, উদ্বেগে রয়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও। রাজধানীর মিরপুরের একটি বেকারির হিসাব অনুযায়ী, গত তিন মাসে এলপি গ্যাসের খরচ মাসে ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা বেড়েছে। এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ার ফলে আরও ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ময়দা, তেল, চিনি ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচ আগেই বেড়েছে। বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার কার্যকর হলে সেই চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে। ফলে বর্তমানে ৪০ টাকায় বিক্রি হওয়া একটি রুটির দাম ৫০ টাকায় উন্নীত করার প্রয়োজন হতে পারে। তবে হঠাৎ করে দাম বাড়ালে ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়াও নেতিবাচক হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
এদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি রফতানিমুখী শিল্পখাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিজিএমইএর পরিচালক রশিদ আহমেদ হোসাইনী বলেন, শিল্পকারখানাগুলো এখনো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছে না। এর মধ্যেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে, যা শিল্পখাতের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। গ্যাস সরবরাহেও অনিশ্চয়তা থাকায় তৈরি পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ইতোমধ্যে এলপি গ্যাসের অস্থির বাজার, জ্বালানি তেলের একাধিক দফা মূল্যবৃদ্ধি এবং সর্বশেষ বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে। এর প্রভাব সরাসরি গ্রাহকদের পাশাপাশি পরোক্ষভাবেও পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে।
অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সহনীয় নয়। এতে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ বিল বাড়বে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়বে। ফলে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে। কারণ উৎপাদন ব্যয় বাড়ার অতিরিক্ত চাপ ব্যবসায়ীরা পণ্যের দামের মাধ্যমে বাজারে সমন্বয় করার চেষ্টা করবেন, যার প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর।
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে চাপে মধ্যবিত্ত, বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের দাম
- আপলোড সময় : ০৫-০৬-২০২৬ ০৮:৫৬:০২ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৫-০৬-২০২৬ ০৮:৫৬:০২ পূর্বাহ্ন
ছবি সংগৃহীত
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
ডেস্ক রিপোর্ট